ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদানসহ নানা সংকটে লামার রুপসীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

unnamedনুরুল করিম আরমান, লামা(বান্দরবান)॥ দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে অবহেলিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে বান্দরবানের লামা উপজেলার রুপসীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ বেয়ে রুপসীপাড়া ইউনিয়ন সদরে বিদ্যালয়টির অবস্থান। শুধু পড়ালেখা নয়, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক ও বাহ্যিক জ্ঞানসহ শিক্ষামূলক নানা কর্মকান্ডেও এগিয়ে এ বিদ্যালয়টি।

বর্তমানে ঝরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, শ্রেনী কক্ষ ও ছাত্রাবাস সংকট এ বিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা। বড় ধরণের ভূমিকম্পে দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে জরাজীর্ন বিদ্যালয় ভবন দুটি, এ আশঙ্কায় আতংকে রয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, পানীয় জল ও বেঞ্চ সংকট রয়েছে প্রকট। নেই নিরাপত্তার জন্য সীমানা প্রাচীরও। হল রুম, লাইব্রেরী, মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ রুম বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও এখানে তা নেই। বিদ্যালয়ে একটি ছাত্রাবাস না থাকায় দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন।

সরজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই রপসীপাড়া ইউনিয়ন সদরে স্থাপিত হয় বিদ্যালয়টি। কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর উদ্যোগে সাড়া দিয়ে রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আবদুল জলিল ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নবী বিদ্যালয়ের জন্য ২ একর ১৮ শতক জমি দান করেন।

পরবর্তীতে এলাকাবাসীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই জমির ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট দু’টি পাঁকা বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করে দেয়। তবে ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করার কারনে কয়েক বছর পর থেকে বর্ষা মৌসুম এলেই অফিস কক্ষসহ প্রত্যেক শ্রেণী কক্ষে ছাঁদ ছুয়ে পানি পড়ে। এতে ভবন দুটি জরাজীর্ণ হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের একমাত্র টিউবওয়েলটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এছাড়া প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই সীমানা প্রাচীর না থাকায় শ্রেণী কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের বারান্দা ও মাঠের ওপর দিয়ে অবাধে চলাফেরা করে বেওয়ারিশ কুকুর, গরু, ছাগল। পানির সুব্যবস্থা না থাকায় টয়লেটের অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ৬৫জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টি সম্প্রদায়ের শিশু এ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। কিন্তু একটি ছাত্রাবাস না থাকায় দারুন ভোগিন্ত পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় গতিশীলতা এবং আরও মনযোগি করে তুলতে আয়োজন করা হয়ে থাকে মা ও অভিভাবক সমাবেশ। জাতীয় দিবসগুলো যথাযথ ভাবে পালন করা হয় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বিদ্যালয়টি সকল শিক্ষক তাদের মেধা, শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক গড়ে তুলতে ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বছরের প্রথম থেকেই শুরু করে পাঠদান কার্যক্রম ও পরিকল্পনা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪১১ জন। তম্মধ্যে প্রাক প্রাথমিকে ৪৭ ও পঞ্চম শ্রেনীতে ৫৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। গত বছর এ বিদ্যালয় থেকে ৫০জন শিক্ষার্থী পিএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে শতভাগই উত্তীর্ণ হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শাহেদা আকতার ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী সানজিদা ইসলাম তন্নিসহ অনেকে জানায়,  একটু বৃষ্টি হলেই বিদ্যালয়ের ছাঁদ ছু‍ঁয়ে পানি পড়ে। এছাড়া শ্রেণী কক্ষ সংকট থাকায় গাদা গাদি করে এক টেবিলে ৭-৮জন করে বসতে হয়। এতে পড়ালেখায় বিঘ্নসহ গ্রীস্ম মৌসুমে গরমে অতিষ্ট হয়ে ওঠে তারা।

শিক্ষার্থীদের সাথে একমত পোষন করে সহকারি শিক্ষক মো. সুলতান আহমদ জানান, বিদ্যালয় ভবন দুটির সব কক্ষেই ছাঁদ ছুঁয়ে পানি পড়ার কারনে বর্তমানে পাঠদান চললেও ঝুঁকি বেড়ে গেছে। তাই বিদ্যালয় ভবন দুটি মেরামতসহ আরও তিন কক্ষ বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ে বেঞ্চ সংকট রয়েছে।

অভিভাবক আবদুল শহিদ, বাবুল ও হাবিবুর রহমান জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আশপাশে আর কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এ বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মানও ভালো। তাই নিজের ছেলে-মেয়েকে এ বিদ্যালয়েই ভর্তি করেছি। তবে বিদ্যালয়ে নানা সমস্যা বিরাজ করছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোবিন এ প্রতিবেদককে বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মচারী সংকট না থাকলেও শ্রেণী কক্ষের তীব্র সংকট রয়েছে। এছাড়া সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়টি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। একটি ছাত্রবাস না থাকায় দূর দূরান্তের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ছাত্রাবাস নির্মান করা হলে শিক্ষা বন্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘব হবে।

বিদ্যালয়ে নানা সমস্যার সত্যতা স্বীকার করে এসএমসির সভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, যেকোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ধসে পড়তে পারে ভবনগুলো। তিনি জানান, বান্দরবান জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটু সুনজর দিলে বিদ্যালয়ের সব সমস্যার সমাধান করা যেত।

দ্রুত জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, শ্রেণী কক্ষ সম্প্রসারন, খাবার পানি ও ছাত্রাবাস সংকট নিরসনসহ নানা সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন-বিদ্যালয়ের অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসি।

খাগড়াছড়ি নিউজ/এস/সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ইং-॥

মতামত...