নতুন করে ৮২ হাজার উপজাতি পুনর্বাসন: পাহাড় থেকে বাঙ্গালিদের বিতাড়িত করার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক।। ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে উদ্বাস্তু সাজিয়ে উপজাতি পরিবারকে পুনর্বাসন ষড়যন্ত্র বন্ধের দাবিতে খাগড়াছড়িতে অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে দুই বাঙ্গালি সংগঠন।

কর্মসূচি থেকে নতুন করে ৮২ হাজার উপজাতি পরিবার নয়, পাহাড়ের প্রকৃত আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ৩৮ হাজার বাঙ্গালি পরিবারকে পুনর্বাসন করার দাবি জানান সংগঠনগুলোর নেতারা।

পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ বুধবার দুপুরে শহরের শাপলা চত্ত¡র থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য বাঙ্গালি ছাত্র পরিষদ। মিছিলে উদ্বাস্তু সাজিয়ে মায়ানমার ও ভারতীয় নাগরিকদের পাহাড়ে পুনর্বাসন বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন বহন করে নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে খাগড়াছড়ি টাস্কফোর্স কার্যালয়ের সামনে যেতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকে বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান নেয়ার পর কার্যালয়ে গিয়ে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান এবং সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার হাতে ৫ দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি তুলে দেন সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ।

এসময় পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাইন উদ্দীন, সাধারণ সম্পাদক এস এম মাসুম রানা, বৃহত্তর পার্বত্য বাঙ্গালি ছাত্র পরিষদের জেলা আহবায়ক জাহেদুল ইসলাম, পার্বত্য নারী অধিকার ফোরামের সভাপতি সালমা আহমেদ মৌ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মারলিপিতে অখন্ড বাংলাদেশের স্বার্থে ৮২ হাজার ভারতীয় ও মায়ানমার নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম পুনর্বাসন ষড়যন্ত্র বন্ধের নির্দেশ প্রদান, অবিলম্বে গুচ্ছগ্রামে বন্দি ৩৮ হাজার ১৫৬টি বাঙ্গালি উদ্বাস্তু পরিবারকে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ৫ একর জায়গায় পুনর্বাসন করা, বাঙ্গালি নেতৃবৃন্দের সাথে সমন্বয় করে প্রকৃত উদ্বস্তুদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা, উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ কর্তৃক বাঙ্গালি উচ্ছেদ মিশনে মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে জোরপূর্বক বাঙ্গালিদের দখলকৃত ভ‚মি ফেরত দেয়াসহ ৫ দফা দাবি রয়েছে।

স্মারকলিপি দেয়ার আগে সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দরা ৮২ হাজার উপজাতি পরিবারকে পুনর্বাসন ষড়যন্ত্র বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ২২ হাজার উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারকে যথাযথভাবে পাহাড়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ২১টি উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার জামতলীতে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন তথা জেএসএস (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি) নেতৃত্বাধীন তৎকালীন শান্তিবাহিনীর হাতে নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৬১ হাজার বাঙ্গালি পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছিলো। যারা এখনো গুচ্ছগ্রামে বন্দি জীবন যাপন করছে। চুক্তি পরবর্তী ১৯৯৮ সালের টাস্কফোর্সের ৩য় বৈঠকে ৩৮ হাজার ১৫৬টি বাঙ্গালি আভ্যান্তরীণ উদ্বাস্তু পরিবারের তালিকা অনুমোদন দেয়ার পরও অদ্যবধি পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন রেখে বলেন, ২০১৪ সালে টাস্কফোর্সের ৫ম সভায় বাঙ্গালি এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করার দাবি উত্থাপিত হলে তখনকার চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন উদ্বাস্তু নেই। তাই বাঙ্গালি উদ্বাস্তুদের তালিকা নাকোচ করা হয়েছিলো। সেই অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের জন্য বাকী কোন উপজাতি পরিবার ছিলোনা। তাহলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় ৮২ হাজার উপজাতি উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত কিভাবে অনুমোদন দিয়েছে টাস্কফোর্সের বর্তমান চেয়ারম্যান সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা?বক্তারা সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে কট্টর সাম্প্রদায়িক ব্যাক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি পাহাড়ে সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও টাস্কফোর্সের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বাঙ্গালিদের বাদ দিয়ে নতুন করে ৮২ হাজার মায়ামনমার ও ভারতীয় নাগরিকদের উপজাতি উদ্বাস্তু সাজিয়ে পাহাড়ে পুনর্বাসন করতে চান।

এতে বাঙ্গালি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মনে করে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান পাহাড়ে কৌশলে বাঙ্গালিদের বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্র করছে। একইসাথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর কাঙ্খিত জুম্মল্যান্ড বানাতে গোপনে মায়ানমার ও ভারত থেকে উপজাতিয় পরিবারকে উদ্বাস্তু সাজিয়ে পাহাড়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্ষায় সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোসহ পুনর্বাসনের তালিকাটি বাতিল করে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত উদ্বাস্তু বাঙ্গালি পরিবারগুলোকে পুনর্বানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তারা।

স্মারকলিপি নেয়ার সময় টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এক প্রশ্নের জবাবে বাঙ্গালি সংগঠনগুলোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় ৮২ হাজার উপজাতি পরিবারদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এটি উপস্থাপিত প্রস্তাবনা মাত্র। চ‚ড়ান্ত কোন তালিকা নয়। পুনর্বাসনের যে তালিকাটি করা হয়েছে তা যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বাঙ্গালিদের এখানে ভুল বুঝার কোন কারন নেই। তাছাড়া সকলের জানা উচিত, টাস্কফোর্স চুক্তি মোতাবেক উপজাতি শরণার্থীদের পুনর্বাসন ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণের জন্য গঠন করা হয়েছে। এখানে অ-উপজাতিয় কিংবা বাঙ্গালিদের বিষয়ে বলা হয়নি। তারপরও বাঙ্গালিদের পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে আইন সংশোধনের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। কারণ আইন মানুষের জন্য। ঐ সময়ে পার্বত্য এলাকার বাঙ্গলিরাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে সকল সম্প্রদায়ের বসবাসের জায়গা। এখানে পাহাড়ি-বাঙ্গালি শব্দকে ব্যবহার করে একটি পক্ষ রাজনীতি কারার চেষ্টা করছে।

খাগড়াছড়ি নিউজ/এস/বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮ইং-।।

মতামত...