লামায় সম্ভাবনার দ্বার খুলবে তুলা চাষ: প্রয়োজন সরকারী সহযোগিতা

cotton-cultivation-picমো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান)॥ ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আর এ ক্ষতিকর ধূমপানের অন্যতম উপাদান হলো তামাক। লাভজনক ও বিক্রয়ত্তোর সেবা নিশ্চিত থাকায় বছরের পর বছর বান্দরবানের লামা উপজেলায় তামাক চাষ করে আসছে স্থানীয় অধিকাংশ কৃষকরা। তারা বিকল্প চাষের কথাও ভাবতেননা। অথচ পাহাড়ে তুলা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন সরকারি সহযোগীতা।

সম্প্রীতি বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা উপজেলার বেশ কয়েকজন কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেন পাহাড়ে  সম্ভাবনাময় তুলা চাষে। এতে প্রথমে আগ্রহ প্রকাশ করেন, উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের মুসলিম পাড়ার কৃষক মোহাম্মদ হোসাইন। তার দেখাদেখি একই ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি ছৌলুমঝিরির আবদুল হালিম, পূর্ব শীলেরতুয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম, জমির হোসেন, আহমদ নবীসহ ৩২ জন কৃষক। এদের প্রতিজনকে ৪০শতক করে ৩২টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে গত জুন মাসে পরীক্ষামূলক চাষে সার্বিক সহযোগিতা করে বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ড।

এসব প্লটের আওতায় পাহাড়ের ঢালে ও সমতল ভূমিতে তুলা চাষে ভালো ফলন দেখা দেওয়ায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন চাষীরা। তাই পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এখানের পাহাড়ে তুলা চাষ করা গেলে কৃষকরা তামাকের মত লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের মোট উৎপাদনের এক-পঞ্চমাংশ তুলা এখান থেকে সংগ্রহ করা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বান্দরবানের তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে দুই প্রজাতির তুলা চাষ হয়ে থাকে, পাহাড়ি তুলা এবং সমভূমির তুলা। পাহাড়ি তুলা পার্বত্যাঞ্চলে জুম চাষে অন্য ফসলের সাথি ফসল হিসেবে চাষ হয়ে থাকে। জুম চাষিদের মূল অর্থকরী ফসল পাহাড়ি তুলা। সমভূমির তুলা পাহাড়ের ঢালে ও সমতল ভুমিতে চাষ হয়ে থাকে। পাহাড়ি তুলার আঁশের দৈর্ঘ্য ০.৫ ইঞ্চি। আঁশ খাটো বলে এই তুলা স্পিনিং মিলে সুতা তৈরীর উপযোগি নয়। জুম চাষিরা উৎপাদিত তুলার একটি অংশ নিজেদের জন্য কম্বল, মোটা কাপড় তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। এছাড়া এই তুলার একটি অংশ লেপের তুলা হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং কিছু অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। সমভূমির তুলার আঁশের দৈর্ঘ্য গড়ে ১.১৫ ইঞ্চি। এই তুলা স্পিনিং মিলে সুতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তুলার বীজ থেকে পশু খাদ্য খৈল, ফ্যাক্ট মুক্ত তৈল ও ফাজ (ব্যন্ডেজ বা গজ) তৈরি করা হয়। গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

পার্বত্যাঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি তুলা চাষের উপযোগি। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চল ‘কার্পাস মহল’ হিসাবে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলের পাহাড়ের পাশাপাশি নদী ও প্রচুর ঝিরি রয়েছে। নদী ও ঝিরির পাড়ের অনুর্বর, বেলে দোঁআশ মাটিতে সমভূমির তুলা ভাল হয়। এছাড়া সমভূমির তুলা পাতাঝড়া উদ্ভিদ বিধায় গাছের মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ জৈব পদার্থ হিসেবে যোগ হয়। ফলে সমভূমির তুলা চাষকৃত জমি উর্বরতা লাভ করে। বছরের জুন মাসের শেষের দিকে ও জুলাই মাসের প্রথম দিকে জমিতে তুলার বীজ বপন করার উপযুক্ত সময়। পাঁচ মাস পর অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তুলা উত্তোলন করা হয়।

বস্ত্র বাংলাদেশের প্রধান শিল্প পণ্য। অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে বস্ত্র শিল্পের অবদান শিল্প খাতের প্রায় ৪০% এবং জাতীয় আয়ের প্রায় ১৩%। দেশে ৩৬৩টি সুতাকলের জন্য বার্ষিক ৪০ লক্ষ বেল (বেল ৪০০ পাউন্ড) আঁশ তুলার চাহিদা আছে। এ পরিমান তুলা আমদানি করতে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ বিপুল পরিমান আঁশ তুলার চাহিদা পূরনের জন্য তুলা উন্নয়ন বোর্ড দেশের সমতল অঞ্চলের পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলেও সমভূমির তুলা চাষ সম্প্রসারনের উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্প্রসারিত তুলা চাষ প্রকল্প (ফেজ-১) এর আওতায় লামা উপজেলার গজালিয়া, ফাঁসিয়াখালী ও রুপসীপাড়া ইউনিয়নে ৩২টি পরীক্ষামূলক প্রদর্শণীর মাধ্যমে দেড়শ হেক্টর পাহাড়ি ও সমতল ভুমিতে সিবি-১২ ও ১৪ জাতের তুলা চাষ করা হয়। এর আগে চাষিদেরকে তুলা চাষের উপর প্রশিক্ষণও প্রদানসহ বিনামেূল্য বীজ, সার, কীটনাশক ও উপকরণ প্রদান করে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু ইলিয়াছ মিয়া সৃজিত তুলা প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন করেন। এসময় বান্দরবান তুলা উন্নয়ন জোনের প্রধান কৃষিবিদ আব্দুল ওহাব, কটন ইউনিট কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম, লামা  কটন ইউনিট কর্মকর্তা আব্দুল খালেক উপস্থিত ছিলেন।

মাঠ পরিদর্শনের সময় তুলা চাষী মো. হোসাইন, মো. হালিম, নুরুল ইসলাম, জমির হোসেন, আহমদ নবীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন শেষে তুলা উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু ইলিয়াছ মিয়া বলেন, চলতি মৌসুমে লামা ইউনিটের অধীনে দেড়শ হেক্টর জমিতে দেশী ও হাইব্রিড জাতের সমভূমি তুলা চাষের আবাদ করা হয়েছে। তবে লক্ষমাত্রা ছিল ২০০ হেক্টর। এ চাষের গুণগত মান ভাল। কোন প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে ভাল ফলন হবে বলে আমরা আশাবাদী। তিনি আরও বলেন, চাষিরা তামাক চাষে অভ্যস্থ ছিল। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ধরণ পাল্টিয়েছে। এখন তামাকের পরিবর্তে কৃষকদেরকে তুলা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, বেশ সাড়াও পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের মুসলিম পাড়ার সমভূমি তুলা চাষি আবু জাফর জানান, আগে তিনি তামাক চাষ করতেন। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্বুদ্ধ করনে চলতি মৌসুমে আড়াই কানি সমতল ভুমিতে তুলা চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। সরকারী সহায়তা পেলে তুলা চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য লামা উপজেলার পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে চাষ করা সম্ভব।

এদিকে সরজমিন পূর্ব শীলেরতুয়া গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়- এখন বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে উন্নত জাতের তুলা আর তুলা ক্ষেত। এ সময় তুলা চাষী নুরুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে তুলা চাষ করতে ১০ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। বিঘা প্রতি ১১ থেকে ১২ মণ তুলা উৎপাদন করা যায়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন, তুলা উন্নয়ন বোর্ড এ চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বিনামেূল্য বীজ, সার, কীটনাশক ও উপকরণ প্রদান করায় অন্য কৃষকরাও সমভূমি জাতের তুলা চাষের দিকে ঝুঁকছে।

খাগড়াছড়ি নিউজ/এস/রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ইং-॥

মতামত...