সরকারি খাস ভূমি দখল: নেপথ্যে পাহাড়কে অশান্ত করার চেষ্টা

বিশেষ প্রতিবেদক ।। খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউপির কুকিছড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প দখল করে বৌদ্ধ মন্দির নির্মানের ২ দিন পার না হতেই আরোও একটি ক্যাম্পের জায়গা দখলে নিতে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। তবে এবার বৌদ্ধ মন্দির নয়, সরকারি খাস জমি দখলে নিয়ে নির্মাণ করতে চায় লক্ষ্মী নারায়ন মন্দির।

অনুমতি ছাড়া সরকারি খাস জমিতে মন্দির তৈরীতে বাঁধা দেয়ায় গুইমারার মত আবারোও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করেছে একটি কুচক্রী মহল।

অভিযোগ, এর নেপথ্যে রয়েছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এসব ঘটনায় দূর্গম এলাকায় বসবাসরত নিরীহ পাহাড়িদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সংগঠনগুলো। মূলত; দুই উদ্দেশ্যে এসব করে থাকেন তারা। এরমধ্যে একটি হলো সরকারি খাস ভূমি দখল। অার এদখলকে ঘিরে পাহাড়ে সাধারণ পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি করে পরিবেশ অশান্ত করা। অন্যটি হলো- সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা। কারণ দখলকে ঘিরে যখন উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি কিংবা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয় তখন নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে সেখানে সেনাবাহিনী নিষেধাজ্ঞা কিংবা বাঁধা প্রদান করে থাকে। এ দুটি বিষয়কে ঘিরে নিরীহ পাহাড়িদের ব্যবহার করে উপজাতি সংগঠনগুলো ফায়দা লুটার চেষ্টা করে থাকে। অতীতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ নানা মহলের।

তবে এবার খাগড়াছড়ির জেলায় ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণে অনেকটা কৌশল পাল্টেছে উপজাতি সংগঠনগুলো। মন্দির কিংবা বিহার নির্মাণে টার্গেট সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প। অার নেপথ্যে অন্যতম কারণ হলো প্রবাদ বাক্যের মত “এক ঢিলে দুই পাখি শিকার”।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিত্যাক্ত সেনা ক্যাম্পের জায়গা মানেই সরকারি খাস ভূমি। এসব জায়গা দখলে নিতে সন্ত্রাসীরা ধর্মীয় স্থাপনা তৈরিকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং তারা জানে এবিষয়ে সেনাবাহিনী বাঁধা দিতে আসবেই। আর তখনি ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে পাহাড়ে আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার করার ফায়দা লুটে অবৈধ অস্ত্রধারীরা।

জানা গেছে, মহালছড়ি জোন অধিনস্ত জেলা সদরের ৪নং মাইসছড়ি ইউনিয়নের দেবতা পুকুর সংলগ্ন নুনছড়ি এলাকায় পরিত্যক্ত একটি সেনাক্যাম্পের স্থানে “পরিত্যক্ত সেনাক্যাম্পের স্থান, অনুমতি ছাড়া দখল নিষেধ” সংবলিত একটি ষ্টিলের সাইনবোর্ড লাগানো ছিলো এবং মহালছড়ি জোন সেখানে নিয়মিত টহল পরিচালনা ও বিশ্রামের জন্য উক্ত স্থানটিকে ব্যবহার করতো।

কিন্তু ‘সরকারী কোন অনুমতি ছাড়াই উক্ত ভূমি অবৈধভাবে দখল করে সেখানে লক্ষ্মী নারায়ন মন্দির নির্মানের নিমিত্তে ২-৩ দিনে মধ্যই একটি ঘর দাড় করায় স্থানীয় উপজাতীয়রা। চারপাশে টিনের ঘেরা ও ছাউনি দেয়া ঘরটি নির্মানের আগে আমপাশে স্থানীয়রা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে উক্ত স্থানটিকে মন্দির নির্মানের উপযোগী করে তোলে।কয়েকদিন আগে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঐ এলাকায় যাওয়ার পর সরকারী ভূমিতে অবৈধভাবে মন্দির ঘর দেখতে পেয়ে মন্দির নির্মাতাদের কাছে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি পত্র দেখতে চাইলে স্থানীয়রা কোন প্রকার জমির মালিকানা বা অনুমতি পত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। পরে তাদের আলোচনার জন্য মহালছড়ি জোনে ডাকা হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে।

গত ২৬ অক্টোবর সকালে জোন অধিনায়কের ডাকে সাড়া দিয়ে ঐ এলাকার ৮টি গ্রামের (থলিপাড়া, পুকুরপাড়া, হেডম্যান পাড়া, গুইমারা পাড়া, ছাতি পাড়া, স্কুল পাড়া, মধ্যম পাড়া, মালতি পাড়া) কার্বারী, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার মুরুব্বীসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী মহালছড়ি জোনে আলোচনা সভায় মিলিত হন। সেখানে জোন অধিনায়ক মন্দির বা কোন ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মানের আগে দানপত্র বা অনুমতিপত্র বা ভূমির মালিকানা লাগে এবং মালিকানা না থাকলে ভবিষ্যতে ঝামেলা হতে পারে মর্মে মন্দির নির্মানকারী ও এলাকাবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হন। পরে তাদের মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে কোন ব্যক্তি মালিকানাধনি ভূমিতে প্রতিঃস্থাপনের অনুরোধ জানান।

এসময় মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে রাজি হন।

আলোচনা সভায় মাইসছড়ি মৌজার হেডম্যান কলিন জ্যোতি চাকমা, পুকুর পাড়ার কার্বারী কুঞ্জ মেহান ত্রিপুরা, গুইমারা পাড়ার কার্বারী কলিধন ত্রিপুরা, মধ্যম পাড়া কার্বারী খুকুমনি ত্রিপুরা, হেডম্যান পাড়া কার্বারী তেজেন্দ্র রোয়াজা, মহিলা কার্বারী দৃহ ত্রিপুরা, গুইমারা ইউনিয়নের ৯ নং ওর্য়াড মেম্বার কইসক ত্রিপুরা ও মন্দির পরিচালনা কমিটির সম্পাদক বিনাচান ত্রিপুরাসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু স্থানীয় নিরীহ গ্রামবাসীরা সোজা কথাটি বুঝে অবৈধ কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলেও সুযোগ সন্ধানী কুচক্রী মহলটি অনেকটাই ব্যথিত হয়ে আর নিজেদের পুরোনো চরিত্র আরেকবার দেখিয়ে দিয়েছে পাহাড়বাসীকে।

সন্ত্রাসীরা তাদের পরিকল্পনা মাফিক এগুতে ভূল করেনি। এবার তাদের মুখের বুলি, “ সেনাবাহিনী মন্দির ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে”। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসকারীরা সেই ১৯৮৬ সালকে টপকে ২০১৮ তে পদার্পন করেছে এটা সন্ত্রাসীদের জানা ছিলোনা। তারা জানেনা আসলে মন্দির ভাঙ্গার নির্দেশ আর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে প্রতিঃস্থাপনের অনুরোধে মধ্যখানে আকাশ পাতাল ব্যবধান।

এদিকে আলোচনা সভায় উপস্তিত থাকা মন্দির পরিচালনা কমিটির সম্পাদক বিনাচান ত্রিপুরা জানান, আমরা জোন অধিনায়ক মহোদয়ের সাথে একমত পোষন করেছি এবং মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নেবার প্রস্তুতি। কিন্তু কে বা কারা এখানে তাদের স্বার্থে অপপ্রচার করছে যা মোটেই কাম্য নয়।

তবে বেশ কয়েকবার মুঠোফোনে কল করার পরেও রহস্যজনক কারণে প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি মাইসছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আম্রে মারমা।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য যোগদানকৃত খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোঃ নাজমুস শোয়েব বলেন, পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্পের ভূমিটি অবশ্যই সরকারী খাস ভূমি। আর সেখানে কোন প্রকার অনুমতি ছাড়া অবৈধ ভাবে দখল করে মন্দির, মসজিদ কিংবা প্যগোডা নির্মান করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাছাড়া পাহাড় কাটা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। যদি কারো সরকারী ভূমি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাহলে তাকে অবশ্যই সরকারী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে তা ব্যাবহার করতে হবে। অন্যথায় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অপরদিকে গুইমারার ঘটনায় প্রশাসন কর্তৃক মন্দির নির্মানসহ দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাসে কাজ শুরু হলেও দেখা গেছে এটি নিয়ে জল ঘোলা করে মাছ শিকারের আশায় পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানেই আন্দোলনের নামে পরিবেশ অশান্ত করার পায়তারা করছে একটি মহল। মহালছড়ির এ ঘটনায়ও ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয়না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো ঘটনা ঘটলেই প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলে তার দায় বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চাপিয়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। কিন্তু তদন্ত শেষে দেখা যায় ঐ সকল ঘটনায় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরাই জড়িত। এসকল ঘটনায় যখনই উপজাতি সংগঠনের সন্ত্রাসীদের নাম আসে তখন সুশীল ও মানবতাবাদী সংগঠনগুলো রহস্যজনক কারণে নীরব হয়ে যায়।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাস নির্মূলে যখনই কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তখনই মিথ্যা নারী ধর্ষণ ইস্যু কিংবা অন্যকোন সমস্যা সৃষ্টি করে অপপ্রচারের মাধ্যমে সেই অপারেশন থামানোর অপচেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। আর তাদের দাবার গুটি হয়ে কাজ করে নিরীহ পাহাড়ীরা।

রাঙামাটির বিলাইছড়িতে দুই মারমা বোনের কল্পিত নির্যাতনের কাহিনী ও বান্দরবানের লামার দুই মারমা বোনের সাম্প্রতিক ধর্ষণ এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী কৃত্তিকা ত্রিপুরাকে ধর্ষণের হত্যার অভিযোগ তার জলন্ত প্রমাণ। তদন্তে যখন প্রমাণ হয় ধর্ষণের অভিযোগ মিথ্যা, তখন পাহাড়ীরা নীরব হয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে থেমে যায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অপারেশন। এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনকে তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটার নিকৃষ্ট হাতিয়ারে পরিণত করেছে।

ধারনা করা হচ্ছে একটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীরা গুইমারার ঘটনায় এদিক সেদিক করতে না পেরে মহালছড়ির নিরীহ গ্রামবাসীদের দাবার গুটিতে পরিনত করে রাষ্ট্র’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকার পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে অনেক ছাড় দিয়ে “শান্তিচুক্তি” করার পরও, এখানকার আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তা মানেনি, এখনো মানছে না। বর্তমানে সংগঠনগুলোর কাজ হচ্ছে মূলত আধিপত্য বিস্তার, চাদাঁবাজি, প্রতিপক্ষকে খুন করা ও বাংলাদেশ আর বাঙালির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা। বাঙালি নাগরিকদের পাহাড় থেকে উচ্ছেদ ও সেনাদের বিতাড়ন করা তাদের পরিকল্পনার অন্যতম অনুসঙ্গ। যে কারণে সব সময় পাহাড়ে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকা সেনাদের নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা ও ফেসবুকে তা ভাইরাল করতে থাকে। যাতে তাদের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠিত হয়।

খাগড়াছড়ি নিউজ/এনবিডি/রোববার, ২৮ অক্টোবর ২০১৮ইং-।।

মতামত...